ছবির ক্যাপশন: সংগৃহীত
তাদের মতে, কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ইসলামপন্থি দলগুলোর মধ্যে জোটগত পুনর্বিন্যাসের আভাস দেখা যাচ্ছে। ফলে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে জামায়াত নেতৃত্বাধীন এই জোটের ভবিষ্যৎ ও কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। শরিকদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে শুধু জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, পরে তা অন্য শরিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। এতে ছোট দলগুলোর মধ্যে অসন্তোষ ও দূরত্ব বাড়ছে। যদিও প্রকাশ্যে কোনো সংকটের কথা স্বীকার করছেন না জামায়াতের দায়িত্বশীল নেতারা। তাদের দাবি, জোটে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও সম্প্রসারণের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।
১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জোটের প্রতিটি দলই এখনো রয়েছে। কিছু কারণে তারা কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে না। শরিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনা চলছে।
জোট-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে জামায়াত ও শরিক দলগুলোর অবস্থান এক নয়। জামায়াত স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা যাচাই ও বিস্তারের লক্ষ্যে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী। অন্যদিকে এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)সহ অধিকাংশ শরিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সমন্বিতভাবে অংশ নেওয়ার পক্ষে।
শরিক দলগুলোর অভিযোগ, এ বিষয়ে তাদের মতামতকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ফলে তারা বিকল্প কৌশল নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, জামায়াতকে বাদ দিয়েই জোটের বাকি শরিকরা নিজেদের মধ্যে আসন ও এলাকা সমন্বয়ের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে জোটের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ইসলামী আন্দোলনের কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে ইতোমধ্যে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় এলাকাভিত্তিক সমঝোতারও সম্ভাবনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগ জোটের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে চলমান আন্দোলনে এর তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব পড়বে না বলেই তাদের ধারণা। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভিন্ন কৌশলে এগোনোর বিষয়টিকে ঝুঁকিপূর্ণও মনে করছেন কেউ কেউ। তাদের আশঙ্কা, জামায়াত ও শরিক দলগুলো আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নিলে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব ভবিষ্যতে জাতীয় নির্বাচন ও বৃহত্তর রাজনৈতিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও পড়তে পারে।
১১ দলীয় জোট ছেড়ে যাওয়া দুটি দলকে নিয়ে হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে নতুন জোট গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। এর অংশ হিসেবে গত ১৬ জুলাই চট্টগ্রামে হেফাজতের আমিরের উপস্থিতিতে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সাতটি দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অংশ নেয় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন।
বৈঠক-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অতীতের মতপার্থক্য পেছনে রেখে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে নীতিগত ঐকমত্য হয়েছে। নতুন জোটের সম্ভাব্য কাঠামো ও কার্যপদ্ধতি নির্ধারণে প্রতিটি দলকে নিজস্ব প্রস্তাব বা রূপরেখা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আগামী ৩ আগস্টের মধ্যে এসব প্রস্তাব জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। এরপর হেফাজতের দায়িত্বশীল নেতারা আবার বৈঠকে বসে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে এখনই ১১ দলীয় ঐক্য ভেঙে যাচ্ছে বা নতুন জোট হচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা শেষে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।
হেফাজতের আলেমদের তত্ত্বাবধানে নতুন কোনো জোট গঠিত হলে তাতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন খেলাফত মজলিস ও খেলাফত আন্দোলনের একাধিক নেতা। তবে তারা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দলীয় ফোরামে আলোচনা করেই নেওয়া হবে।
অন্যদিকে ১১ দলীয় জোটে থাকা কওমি ঘরানার অন্যান্য দল বলছে, সবকিছু এখনো প্রাথমিক আলোচনা পর্যায়ে রয়েছে। নতুন জোটে যোগ দেওয়া বা বর্তমান জোটে থাকার বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইযহার কালবেলাকে বলেন, এখন পর্যন্ত তাদের সিদ্ধান্ত ১১ দলীয় ঐক্যেই থাকা। জোট ছাড়ার বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তবে কওমি ঘরানার সাত দলের ঐক্য চূড়ান্ত হলে তখন পরিস্থিতি বিবেচনা করা হবে।
ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, সাত দলের নতুন জোট গঠিত হলে তার রাজনৈতিক তাৎপর্য থাকবে। তিনি বলেন, আগে সবাই একসঙ্গে ছিল, পরে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। হেফাজতের উদ্যোগে আবারও ঐক্যের চেষ্টা চলছে। একসঙ্গে দুটি জোটে থাকার সুযোগ নেই, তাই দলগুলোকে যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে ঐক্য দৃশ্যমান হলে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া হবে, অন্যথায় দল এককভাবে নির্বাচন করবে।
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের বলেন, নিজেদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনার জন্যই সবাই একসঙ্গে বসেছে। প্রতিটি দলের লিখিত পরামর্শ পাওয়ার পর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে। জোট গঠনে এখনো সময় লাগবে।
নতুন এই জোট গঠনের উদ্যোগের পেছনে বিএনপি সরকারের ইন্ধন রয়েছে বলে সন্দেহ করছে জামায়াত। তাদের শঙ্কা, সাত দলের ঐক্য হলে বর্তমান জোট থেকে আরও কয়েকটি দল বেরিয়ে যেতে পারে। এ বিষয়ে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, বিরোধী দলের আন্দোলনকে গণতান্ত্রিকভাবে মোকাবিলা করতে না পেরে সরকার ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নিয়েছে। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আন্দোলন আরও বেগবান হবে এবং সেখানে আরও অনেক দলের সমর্থন থাকতে পারে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আসন সমঝোতা এবং সংরক্ষিত নারী আসনে ছাড় না পাওয়ায় খেলাফত আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। পাশাপাশি জোটে মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং এনসিপিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগও ছিল। এছাড়া উচ্চ কক্ষ গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াতের এককভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণেও ক্ষোভ বাড়ে। এসব কারণেই দুটি দল জোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
খেলাফত মজলিসের নেতাদের মতে, সংসদ নির্বাচনে আসন সমঝোতার সময় তাদের ন্যায্য মূল্যায়ন করা হয়নি। জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে আন্দোলন চললেও জামায়াত নিজেদের নির্বাচনি প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। তাই জোটে যথাযথ মূল্যায়ন না পাওয়ায় তারা আপাতত এককভাবে কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে দেশ, জাতি ও ইসলামের স্বার্থে ভবিষ্যতে বৃহত্তর ঐক্যের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ইসলামপন্থি দলগুলোর মধ্যে বৃহত্তর ঐক্যের আলোচনা শুরু হয়। প্রথমে ইসলামী আন্দোলনের আমির চরমোনাই পীরের নেতৃত্বে 'সমমনা ইসলামপন্থি' ব্যানারে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টির মধ্যে ঐক্য গড়ে ওঠে। পরে জামায়াতে ইসলামী যোগ দেয়। পরবর্তী সময়ে এনসিপি, এবি পার্টি, খেলাফত আন্দোলন ও এলডিপিসহ আরও কয়েকটি দল যুক্ত হলে এটি ১১ দলীয় ঐক্যে রূপ নেয়। তবে সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আসন ভাগাভাগির বিরোধে ভোটের আগেই জোট ছাড়ে ইসলামী আন্দোলন। পরে বাংলাদেশ লেবার পার্টি যোগ দেওয়ায় সদস্যসংখ্যা ১১-ই থাকে। কিন্তু চলতি বছরের জুনে খেলাফত আন্দোলন এবং গত শনিবার খেলাফত মজলিস জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।