ফরিদপুরে অস্ত্রোপচারের সময় পেটের ভেতর গজ কাপড় রেখেই সেলাই করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। দীর্ঘ দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে ঢাকায় চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা গেছেন কনিকা মণ্ডল (৩৬) নামে এক গৃহবধূ। পরিবারের দাবি, চিকিৎসকের অবহেলার কারণে তার শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হয়। তাকে বাঁচাতে প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয় করেও শেষরক্ষা হয়নি।
বুধবার (১৯ আগস্ট) রাত সোয়া ২টার দিকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কনিকার মৃত্যু হয়। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিষয়টি স্বজনদের মাধ্যমে গণমাধ্যমে জানাজানি হয়।
কনিকা রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামের অশান্ত মণ্ডলের স্ত্রী। মৃত্যুকালে তিনি দুই ছেলে ও দেড় মাস বয়সী এক কন্যাসন্তান রেখে গেছেন।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৯ জুন প্রসবব্যথা নিয়ে কনিকা ফরিদপুর শহরের নিলটুলী মুজিব সড়ক এলাকার সমরিতা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। ওই দিন সন্ধ্যায় প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ সার্জন ডা. লক্ষ্মী রানী দত্ত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার সন্তান প্রসব করান।
অস্ত্রোপচারের পরদিন থেকেই কনিকার পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায় এবং তীব্র ব্যথা শুরু হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ স্বজনদের।
অবস্থার অবনতি হলে ৩ জুলাই কনিকাকে ঢাকার কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ৭ জুলাই সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. আবদুল জলিলের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। পরিবারের দাবি, পরীক্ষায় অস্ত্রোপচারের সময় কনিকার পেটের ভেতরে প্রায় দেড় কেজি ওজনের বড় একটি সার্জিক্যাল মব বা গজ কাপড় রেখে সেলাই করার বিষয়টি ধরা পড়ে।
পরে জরুরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পেট থেকে গজটি বের করা হয়। কিন্তু ততদিনে তার শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটে। টানা চার দিন আইসিইউতে থাকার পরও সংকট কাটেনি। এরপর আরও ৪৮ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর বুধবার রাতে মৃত্যু হয় তার।
কনিকার দেবর সমীর মণ্ডল অভিযোগ করেন, চিকিৎসার পেছনে পরিবারের প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এত চিকিৎসার পরও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় দায়ী চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
এদিকে কনিকার মৃত্যুর পর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ডা. লক্ষ্মী রানী দত্ত তার স্বামী অশান্ত মণ্ডলের হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা পাঠান। সেখানে তিনি নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। বার্তায় তিনি লেখেন, ‘ভুল মানুষেরই হয়’ এবং ঘটনার জন্য বারবার ক্ষমা চান।
তবে চিকিৎসকের এই ক্ষমা প্রার্থনায় সন্তুষ্ট নন কনিকার স্বামী অশান্ত মণ্ডল। তার অভিযোগ, চিকিৎসকের অবহেলার কারণেই স্ত্রীকে হারিয়েছেন তিনি। সদ্যোজাত সন্তানসহ পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে সমরিতা জেনারেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মহসিন শরীফ জানান, তিনি ঘটনাটি শুনেছেন। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকই বিস্তারিত বলতে পারবেন।
অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. লক্ষ্মী রানী দত্তের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘খেয়াল নেই, পরে ফোন দিচ্ছি’ বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর সাড়া দেননি।
ফরিদপুরের সিভিল সার্জন মাহমুদুল হাসান জানান, বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি কনিকার মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পেরেছেন। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
নিউজটি পোস্ট করেছেন :
Modern Television