আজ বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। তবে এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দলটির জন্য অন্য যেকোনো বছরের তুলনায় ভিন্ন। কারণ, প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ছাড়া প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে দলটি।
গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান দীর্ঘদিনের এই বিএনপি চেয়ারপারসন। তাঁর মৃত্যুতে অবসান ঘটে দেশের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী এক নেত্রীর দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের। ফলে এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের পাশাপাশি খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন, আন্দোলন-সংগ্রাম ও নেতৃত্ব বিশেষভাবে স্মরণ করছে বিএনপি।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় পাঁচ দশকের পথচলায় দলটি একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে, আবার দীর্ঘ সময় বিরোধী দল হিসেবেও রাজপথে আন্দোলন করেছে। নানা রাজনৈতিক সংকট, আন্দোলন ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিএনপি এখন দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি।
দলটির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি জড়িয়ে আছে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে। ১৯৮২ সালে রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার পর ১৯৮৪ সালের ১০ মে কাউন্সিলের মাধ্যমে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। এরপর আমৃত্যু দলটির নেতৃত্বে ছিলেন তিনি।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির হাল ধরেন খালেদা জিয়া। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি দলের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করেন। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। ওই আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি।
খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের রাজনৈতিক পালাবদলেও বিএনপির নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট জয়ী হলে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া।
তবে রাজনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন নানা সংকট ও বিতর্কেও ঘেরা ছিল। ২০০৭ সালের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা, মামলা ও কারাবাসের মধ্য দিয়ে কঠিন সময় পার করতে হয় তাঁকে। ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় সাজা হওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়ে। এসব মামলাকে শুরু থেকেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছে বিএনপি।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কারামুক্ত হলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরতে পারেননি খালেদা জিয়া। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
তাঁর অনুপস্থিতিতে এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তাই বিএনপির নেতা-কর্মীদের কাছে বিশেষ আবেগের। দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শের পাশাপাশি খালেদা জিয়ার দীর্ঘ নেতৃত্ব ও গণতন্ত্রের আন্দোলনের ইতিহাসও সামনে আনছে বিএনপি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দলীয় ঐক্য ধরে রাখা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা আরও শক্তিশালী করা এবং নতুন নেতৃত্বকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা। দীর্ঘদিন দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছে খালেদা জিয়া ছিলেন ঐক্যের অন্যতম প্রধান প্রতীক।
এ অবস্থায় দলের নতুন নেতৃত্বে তারেক রহমানের ভূমিকা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকার পর দেশে ফিরে তিনি বিএনপির নেতৃত্বে নতুন পর্যায়ের সূচনা করেছেন। ফলে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে ধারণ করে দলকে সামনে এগিয়ে নেওয়া তাঁর জন্যও বড় রাজনৈতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির রাজনৈতিক বার্তায় তাই দুটি বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে—প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের আদর্শ এবং খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম। এই দুই উত্তরাধিকারকে সামনে রেখে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পথচলার দিকনির্দেশনা দিতে চাইবে দলটি।
৪৮ বছরের পথচলায় বিএনপির উত্থান-পতন, সরকার পরিচালনা, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বড় অংশ জড়িয়ে রয়েছে। আর সেই ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা একটি দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘গণতন্ত্রের মাতা ও আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দেখিয়ে দেওয়া গণতন্ত্রের পথেই বিএনপির পথচলা। যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, জাতীয়তাবাদ থাকবে, তত দিন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।’
সব মিলিয়ে, এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য শুধু ৪৮ বছর পূর্তির আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার স্মরণের পাশাপাশি তাঁর অবর্তমানে বিএনপির নতুন অধ্যায়ে প্রবেশের একটি প্রতীকী মুহূর্ত।চাইলে এটিকে আমি আরও শক্তিশালী টিভি রিপোর্টিং ভাষায়—যমুনা/সময় টিভির নিউজ প্যাকেজের মতো ২–৩ মিনিটের ভয়েসওভার স্ক্রিপ্ট হিসেবেও সাজিয়ে দিতে পারি।
নিউজটি পোস্ট করেছেন :
Modern Television